আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার কারণ কি ছিল - Agartala Case

প্রিয় বন্ধুরা আসসালামু আলাইকুম, আশা করছি সবাই ভাল আছেন। আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় হল- আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার কারণ কি ছিল, আগরতলা মামলার কারণ, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামী কে ছিলেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ফাঁস করেন কে, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা mcq, আগরতলা কোথায় অবস্থিত, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামী কে ছিলেন, সার্জেন্ট জহুরুল হক আগরতলা মামলার কততম আসামি ছিলেন, ঐতিহাসিক আগরতলা মামলা ও গণঅভ্যুত্থান। 


আপনি যদি আজকের লেখাটি সম্পূর্ন পড়তে পারলে আগরতলা নিয়ে আর কনফিউস থাকবে না। ইনশাআল্লাহ



আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ছবি | আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার কারণ
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ছবি


চলুন শুরু করা যাক:- 

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার কারণ, ১৯৬৮

১৯৬৬ সালে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ৬ দফা আন্দোলন অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠে। ৬ দফা আন্দোলনের জনপ্রিয়তায় আইয়ুব সরকার শংকিত হয়ে পড়ে। সরকার বিভিন্নভাবে এ আন্দোলনকে দমন করার চেষ্টায় লিপ্ত হয়। জেলজুলুম ও নির্যাতন করেও যখন আন্দোলন দমানাে যাচ্ছিল না তখন আইয়ুব সরকার ৬ দফা আন্দোলনকে চিরতরে নস্যাৎ করার জন্য নতুন চক্রান্তের শুরু করে। 


যার ফলশ্রুতিতে ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করা হয়। কিন্তু এ মামলা আইয়ুব সরকারের জন্য ব্যুমেরাং হয়ে দেখা দেয়। এ মামলার ফলে বাঙালি জাতির জাগরণ এবং শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব ও জনপ্রিয়তা শীর্ষে পৌছে। এর সূত্র ধরেই সংঘটিত হয় ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান। যার ফলশ্রুতিতে স্বৈরশাসক আইয়ুবের পতন ঘটে।


১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে আইয়ুব সরকার শেখ মুজিবুর রহমানকে এক নম্বর আসামি করে মােট ৩৫ জন বাঙালি সামরিক বেসামরিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোতি এক মামলা দায়ের করে যা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে পরিচিত। এ আনুষ্ঠানিক নাম ছিল রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য। তবে শেখ মুজিবুর রহমান এটিকে ‘ইসলামাবাদ ষড়যন্ত্র মামলা’ হিসেবে অভিহিত করেন। 


মামলার অভিযােগে বলা হয় ১নং আসামি ভারতের সাহায্যে সশস্ত্র পন্থায় , পাকিস্তানকে পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন বা স্বাধীন করার লক্ষ্যে এক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। আরাে বলা হয়, মুজিব এবং তার সহযােগীরা এ ব্যাপারে ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনের সঙ্গে যােগাযােগ রক্ষা করে চলেন। 


এমনকি, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এরা গােপন বৈঠকে মিলিত হয়। তাকে সরকারি ভাষা অনুযায়ী এ ষড়যন্ত্রের তথ্য উদঘাটিত হয় ১৯৬৭ সালের দিকে। বছরের ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে সরকার সামরিক ও বেসামরিক বাহিনীতে চাকরিরত, চাকরি থেকে অবসরপ্রাপ্ত এবং রাজনীতির সাথে মুক্ত কয়েকজন বাঙালি কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়ার সংবাদ জানতে পারে । 


তখন থেকে পাকিস্তান প্রতিরক্ষা আইন এবং ডিফেন্স সার্ভিসেস আইনে গ্রেফতার শুরু হয়। ১৯৬৮ সালের ১ জানুয়ারি সরকারি প্রেস নােটে বলা হয়, কিছু সংখ্যক সরকারি কর্মচারীকে রাষ্ট্রদ্রোহী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার অভিযােগে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রথমে ৬ জন সামরিক কর্মকর্তা এবং ২ জন সিএসপি অফিসারসহ মােট ৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৬৮ সালের ৬ জানুয়ারি আরেক প্রেসনােট থেকে জানা যায়। গ্রেফতারকৃতদের সংখ্যা ২৮। 


এ তালিকায় সিএসপি অফিসার ছাড়াও পাকিস্তান সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, পিআইএ এবং ইপিআর এর লােকসহ আওয়ামী লীগের নেতারা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। উল্লেখ্য, তখনাে শেখ মুজিবকে এ মামলায় জড়ানাে হয়নি। 


প্রথমে মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছিল লে. কর্নেল মােয়াজ্জম হােসেনকে। এর কয়েকদিন পরে ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি তারিখে সরকারি প্রেসনােটের মাধ্যমে অনেক আগে থেকে আটক শেখ মুজিবুর রহমানকে এ মামলায় জড়িত করে ১নং আসামি করা হয়। উল্লেখ্য, ১৯৬৬ সালের ৮ মে থেকে শেখ মুজিবুর রহমান জেলে আটক ছিলেন। 


তার প্রায় ১১ মাস পরে ১৯৬৮ সালে ১৭ জানুয়ারি রাতে তাকে ঢাকা জেল মুক্তি দিয়ে পুনরায় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেফতার করা হয়। ১৮ জানুয়ারি সরকারি প্রেসনােটে বলা হয়, আগরতলা ষড়যন্ত্রের সাথে শেখ মুজিবুর রহমানের জড়িত থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। কাজেই অন্যদের সাথে তাকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। 


এভাবে, শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ধ্বংস এবং আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে পরিচালিত ৬ দফা আন্দোলনকে দমন করার উদ্দেশ্যে সরকার এবং হয়রানিমূলক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার মিথ্যা কাহিনি তৈরি করে।




আগরতলা মামলায় অভিযুক্তদের তালিকা


আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামির সংখ্যা ছিল ৩৫। শেখ মুজিবুর রহমানকে ১ নং আসামি করা হয়। সামরিকবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে মূল উদ্যোক্তা হিসেবে চিহ্নিত করা হয় ২ নং আসামি লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মােয়াজ্জম হােসেনকে আসামিদের মধ্যে সিএসপি (CSP) অফিসার ছিলেন ৩ জন। অন্যরা হলেন সামরিকবাহিনীর সদস্য এবং রাজনীতিবিদ। নিম্নে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামিদের নামের তালিকা সংযুক্ত করা হলাে-


১. শেখ মুজিবুর রহমান (ফরিদপুর) 
২. লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মােয়াজ্জেম হােসেন (বরিশাল) 
৩. স্টুয়ার্ট মুজিবুর রহমান (ফরিদপুর) 
৪. প্রাক্তন এল. এস সুলতান উদ্দিন আহমদ (কাপাসিয়া,ঢাকা) 
৫. এল. এস নুর মােহাম্মদ (ঢাকা) 
৬. আহমদ ফজলুর রহমান সি.এস.পি (ঢাকা) 
৭. ফ্লাইট সার্জেন্ট মফিজুল্লাহ (নােয়াখালী)। 
৮. প্রাক্তন কর্পোরাল এ.বি সামাদ (বরিশাল) 
৯. প্রাক্তন হাবিলদার দলিল উদ্দিন (বরিশাল) 
১০. রুহুল কুদ্স সি.এস.পি (খুলনা)। 
১১. ফ্লাইট সার্জেন্ট ফজলুল হক (বরিশাল)। 
১২. ভূপতি ভূষণ চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরী (চট্টগ্রাম) 
১৩. বিধান কৃষ্ণ সেন (চট্টগ্রাম) 
১৪. সুবেদার আব্দুর রাজ্জাক (কুমিল্লা)। 
১৫. মুজিবুর রহমান, ইপিআর (কুমিল্লা)। 
১৬. সাবেক ফ্লাইট সার্জেন্ট আব্দুর রাজ্জাক (কুমিল্লা) 
১৭. সার্জেন্ট জহুরুল হক (নােয়াখালী) 
১৮. মােহাম্মদ খুরশিদ (ফরিদপুর)। 
১৯. কে. এম. শামসুর রহমান সি.এস.পি (ঢাকা) 
২০. রিসালদার এ. কে. এম শামসুল হক (ঢাকা) 
২১. হাবিলদার আজিজুল হক (বরিশাল) 
২২. এস.সি মাহফুজুল বারী (নােয়াখালী) 
২৩. সার্জেন্ট শামসুল হক (নােয়াখালী)
২৪. মেজর শামসুল আলম (ঢাকা) 
২৫. ক্যাপ্টেন মােহাম্মদ আব্দুল মােতালিব (ময়মনসিংহ) 
২৬. ক্যাপ্টেন শওকত আলী মিয়া (ফরিদপুর) 
২৭. ক্যাপ্টেন খন্দকার নাজমুল হুদা (বরিশাল)। 
২৮, ক্যাপ্টেন এ. এন নূরুজ্জামান (ঢাকা)। 
২৯. সার্জেন্ট আব্দুল জলিল (ঢাকা) 
৩০. মােহাম্মদ মাহবুবুদ্দিন চৌধুরী (সিলেট) 
৩১. ফার্স্ট লেফটেন্যান্ট এম, এস, এস রহমান (যশাের)। 
৩২. প্রাক্তন সুবেদার তাজুল ইসলাম (বরিশাল) 
৩৩, মােহাম্মদ আলী রেজা (কুষ্টিয়া)। 
৩৪. ক্যাপ্টেন খুরশিদ উদ্দিন আহমেদ (ময়মনসিংহ)। 
৩৫. লেফটেন্যান্ট আব্দুর রউফ (ময়মনসিংহ)।






প্রায় ৮ মাসব্যাপী এ মামলার কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ব্রিটেনের বিখ্যাত আইনজীবী স্যার টমাস উইলিয়াম শেখ মুজিবর রহমানের পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন। 


আগরতলা ষড়যন্ত্র মামালার প্রতিক্রিয়ায় আইয়ুব বিরোধী গণআন্দোলনে পূর্ব পাকিস্তানের জনগন বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ৬৯-এর গণঅভ্যূথানের একটি অন্যতম লক্ষ্য ছিল আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবকে মুক্ত করে আনা। এ সময়ে জনতার  স্লোগান ছিল, ‘জেলের তালা ভাঙব, শেখ মুজিবকে আনব’। অবশেষে আইয়ুব সরকার ব্যাপক গণবিক্ষোভের মুখে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারিতে আগরতলা যড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় এবং ঐ দিনই শেখ মুজিবর রহমানসহ এ মামলার অভিযুক্ত সকল বন্দি মুক্তি লাভ করেন। 


আগরতলা যড়যন্ত্র মামলার ফলাফল 

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাকে আইয়ুব সরকার রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। সরকারের উদ্দেশ্যে ছিল ৬ দফা আন্দোলনকে চিরতরে নস্যাৎ করা। কিন্তু এর উল্টো ফল বয়ে আনে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার কারণে ছয়দফার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়, বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তা আরো বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। 

আরো মজার বিষয় হলো আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ফলাফল হিসাবে আইয়ুব খানের পতন ঘটে। 



বিসিএস এর সকল বিষয়ের সবার আগে আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।

*

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
নবীনতর পূর্বতন