শৈবাল (Algae) কী | শৈবাল এর অর্থনৈতিক গুরুত্বসহ বিস্তারিত

অনলাইন ওয়েব ট্রিগারে আপনাকে স্বাগতম। আজকে আমরা আলোচনা করব শৈবাল কি এবং শৈবাল এর অর্থনৈতিক গুরুত্বসহ বিস্তারিত। জীববিজ্ঞানের প্রতিটি বিষয়ে আপডেট পেতে চাইলে আমাদের ফেসবুক পেজ ফলো করতে পারেন।


শৈবাল কী | শৈবাল এর অর্থনৈতিক গুরুত্বসহ বিস্তারিত
সামুদ্রিক শৈবালের ছবি


{tocify} $title={পরিচ্ছেদসমূহ}



শৈবাল (Algae) কী?

বিজ্ঞানী ক্যারোলাস লিনিয়াস Algae (ল্যাটিন ‍algae = সামুদ্রিক আগাছা) শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। Algae - এর বাংলা হচ্ছে শৈবাল (অনেক সময় একে শেওলা নামেও ডাকা হয়)। পরিবহন কলাবিহীন ও সালোকসংশ্লেষণকারী যেসব থ্যালয়েড জীব জীবনচক্রে ভ্রূণ সৃষ্টি করে না তাদেরকে শৈবাল বলে। 

শৈবালদেরকে প্রচলিতভাবে অপুষ্পক উদ্ভিদ বলা হয়, কিন্তু এদের প্রোটিস্ট বলা উচিত, কারণ- জীবজগতের আধুনিক শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী এরা কিংডমের Protista অন্তর্ভূক্ত। স্বভোজী জীবের মধ্যে এরাই সরল প্রকৃতির। সবুজ শৈবাল থেকে উচ্চশ্রেণির উদ্ভিদের আর্বিভাব হয়েছিল বলে মনে করা হয়। পৃথিবীর মোট ফটোসিনথেসিসের প্রায় ৬০ ভাগই শৈবাল করে থাকে, বাকি ৪০ ভাগ উচ্চশ্রেণির উদ্ভিদ (Plantae Kingdom) করে।

অবস্থান অনুসারে বিভিন্ন নামের শৈবালের 

ক্ষুদ্র প্রকৃতির যে সমস্ত শৈবাল পানিতে সম্পূর্ণ ভাসমান অবস্থায় থাকে তাদের ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন বলে। জলাশয়ে পানির নিচে মাটিতে আবদ্ধ হয়ে জন্মানো শৈবালকে বেনথিক শৈবাল বলে। পাথরের গায়ে জন্মানো শৈবালকে লিথোফাইট বলে। উচ্চশ্রেণির জীবের টিস্যুভ্যন্তরে, যেমন- উদ্ভিদের ভেতরে জন্মালে তাদের এন্ডোফাইট এবং প্রাণিদেহের ভেতরে জন্মিলে তাদের এন্ডোজুয়িক বলে। দেয়ালে বা প্রাচীরের উপর জন্মানো শৈবালকে অর্ধবায়ব বা সাব-অ্যারিয়াল শৈবাল বলে।

নিচে বিভিন্ন প্রকার শৈবালের ছবি

শৈবাল কী | শৈবাল এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব |  বিভিন্ন প্রকার শৈবালের ছবি
 বিভিন্ন প্রকার শৈবালের ছবি




ফাইকোলজি কাকে বলে?

শৈবাল সম্পর্কিত বিজ্ঞানকে ফাইকোলজি বলে এবং এ শাখার বিজ্ঞানীদের ফাইকোলজিস্ট বলা হয়। বাংলাদেশের প্রখ্যাত ফাইকোলজিস্ট হচ্ছেন এ. কে. এম. নুরুল ইসলাম।

শৈবালের বৈশিষ্ট্য

১. এদের দেহ থ্যালয়েড (সমাঙ্গ) অর্থাৎ সত্যিকার মূল, কান্ড ও পাতা অনুপস্থিত।
২. এরা সালোকসংশ্লেষণকারী স্বভোজী (ব্যতিক্রম: Polytoma, Prototheca ইত্যাদি পরভোজী)
৩. সেলুলোজ ও পেকটিন দিয়ে গঠিত কোষপ্রাচীর থাকে।
৪. এদের দেহে ভাস্কুলার টিস্যু অনুপস্থিত অর্থাৎ অভাস্কুলার।
৫. এদের সঞ্চিত খাদ্য প্রধানত শর্করা (কার্বোহাইড্রেট) জাতীয়, কিছু ক্ষেত্রে অ্যালকোহল, চর্বি বা তেল।
৬. যৌন জনন আইসোগ্যামাস, অ্যানাইসোগ্যামাস বা ঊগ্যামাস প্রকৃতির।
৭. শৈবালের দেহ এককোষী বা বহুকোষী।




শৈবালের অর্থনৈতিক গুরুত্ব

শৈবালের উপকারিতা ও অপকারিতা উভয়ই আছে। তাই আমরা প্রথমে শৈবালের উপকারিতা এবং পরে শৈবালের অপকারিতা নিয়ে আলোচনা করব।

(ক) শৈবালের উপকারিতা:

১। খাদ্য হিসাবে শৈবালের গুরুত্ব: প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ অনেক শৈবালকে খাদ্য হিসাবে বা খাদ্যের উপাদান হিসাবে ব্যবহার করে আসছে। জাপানিদের একটি প্রিয় খাবার 'Kombu' যা Laminaria দিয়ে তৈরি করা হয়। Spirulina - কে অনেকেই ‘ভবিষ্যতের সেরা খাদ্য’ হিসাবে মন্তব্য করেন। Spirulina উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ (৬৫%), এতে প্রচুর পরিমাণে B1, B2, B12 এবং E ভিটামিন থাকে।

২। নাইট্রোজেন সংবন্ধনে শৈবালের গুরুত্ব: অনেক নীলাভ সবুজ শৈবাল (যেমন-Nostoc, Anabaena) নাইট্রোজেন সংবন্ধনের মাধ্যমে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। এতে ফসলের ফলন বৃদ্ধি পায়। 

৩। উৎপাদক হিসাবে শৈবালের গুরুত্ব: বিভিন্ন জলাশয়ে ফুড চেইনের প্রধান উৎপাদক হিসাবে শৈবাল ভূমিকা রাখে।

৪। বায়ুমন্ডলে অক্সিজেন সংযোগে শৈবালের গুরুত্ব: এক সময় বায়ুমন্ডলে অক্সিজেন ছিল না, নীলাভ সবুজ শৈবালই প্রথম সালোকসংশ্লেষণ শুরু করে এবং লক্ষ লক্ষ বছর এ প্রক্রিয়ায় বায়ুমন্ডলে অক্সিজেন সংযোগ হতে হতে বর্তমান পর্যায়ে (প্রায় ২০ ভাগ) হয়েছে। বায়ুমন্ডলে অক্সিজেন সংযোগ করাই শৈবালের সবচেয়ে উপকারী দিক।

৫। বায়োফুয়েল তৈরিতে শৈবালের গুরুত্ব: Biofuel বা Biodiesel তৈরির জন্য বর্তমানে শৈবালকে ব্যবহার করা হয়। এ কারণে শৈবালকে Second generation Biofuel নামে অভিহিত করা হয়।

৬। পরিবেশ দূষণরোধে শৈবালের গুরুত্ব: মোট সালোকসংশ্লেষণের ৬০-৭০% শৈবালে ঘটে। সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় শৈবাল কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহন এবং অক্সিজেন ত্যাগ করে পরিবেশ ভারসাম্যপূর্ণ হয় ও দূষণরোধ হয়।

৭। গোয়েন্দা সাবমেরিন - এর অবস্থান নির্ণয়ে শৈবালের ব্যবহার: নীলাভ সবুজ শৈবালের ফাইকোবিলিন প্রোটিন নামক রঞ্জক কণিকা দৃশ্যমান আলোর বাইরের আলোকরশ্মি শোষণ করতে পারে। এই রঞ্জক কণিকা পানির নিচে গোয়েন্দা সাবমেরিন এর অবস্থান নির্ণয় করা যায়।

৮। সমুদ্রে মাছের অবস্থান নির্ণয়ে শৈবালের গুরুত্ব: সমুদ্রে বিশেষ বিশেষ স্থানে যেখানে প্রচুর শৈবাল জন্মে সেখানে খাদ্যের জন্য মাছ ছুটে আসে। স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণে ঐ অঞ্চলগুলো নির্ণয় করে মাছ ধরার ট্রলারকে অবস্থান নির্দেশ করা যায়। এতে অল্প সময়ে প্রচুর মাছ ধরা সম্ভব হয়।

৯। মাটির বয়স নির্ণয়ে শৈবালের ব্যবহার: জলাশয়ের তলদেশে মাটির স্তরে জমাকৃত ডায়াটমের খোলস - এর কার্বন ডেটিং করে ঐ মাটির উৎপত্তির বয়স নির্ণয় করা যায়।

১০। মহাকাশ গবেষণায় শৈবালের ব্যবহার: বর্তমানে মহাকাশ গবেষণায় অক্সিজেনের উৎস ও খাদ্য হিসাবে Chlorella নামক শৈবাল ব্যবহারের চেষ্টা করা হচ্ছে।

১১। চিকিৎসার ক্ষেত্রে শৈবালের গুরুত্ব: Laminaria Sargassum গলগন্ড রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার হয়। Chlorella থেকে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ তৈরি করা হয়। 


(খ) শৈবালের অপকারিতা: 

১। ওয়াটার ব্লুম (Water bloom) সৃষ্টি: জলাশয়ে পুষ্টির পরিমান বেড়ে গেলে কিছু নীলাভ সবুজ শৈবাল () দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধি করে পানি দূষণ ঘটায়, এ অবস্থাকে ওয়াটার ব্লুম বলে। এরুপ পানির খাবার ও ব্যবহারের অনুপযোগী হয় এবং মাছও মারা যায়। ওয়াটার ব্লুম সৃষ্টিকারী শৈবালগুলো হচ্ছে - Microcystis, Oscillatoria, Nostoc, ইত্যাদি।

২। উদ্ভিদের রোগ সৃষ্টি: Cephaleuros virescens নামক শৈবাল চা, কফি, ম্যাগনোলিয়া ইত্যাদি উদ্ভিদের রোগ সৃষ্টি করে। এর ফলে চা এবং কফির ফলন কমে যায়।

৩। মাছের রোগ সৃষ্টি: Oedogonium নামক শৈবাল মাছের ফুলকা রোগ সৃষ্টি করে।

৪। রাস্তাঘাট পিচ্ছিল করণ: ইত্যাদি নীলাভ সবুজ শৈবালের মিউসিলেজ আবরণ নদীর ঘাট, পুকুরঘাট, বাথরুমের মেঝে এবং হাঁটার রাস্তা পিচ্ছিল করে। এতে পা পিছলে অস্থিভাঙ্গা থেকে মৃত্যুও ঘটতে পারে।

শৈবালের সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর: 

১। নীলাভ সবুজ শৈবালকে সায়ানোব্যাকটেরিয়া বলা হয় কেন?

উত্তর: নীল বর্ণের ব্যাকটেরিয়াকে সায়ানোব্যাকটেরিয়া বলে। শৈবালের মতো সায়ানোব্যাকটেরিয়া সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি এবং অক্সিজেন উৎপাদন করতে পারে বলে নীলাভ সবুজ শৈবালকে সায়ানোব্যাকটেরিয়া বলে।

২। BGA -এর পূর্ণরুপ কি?

উত্তর: Blue Green Algae.

৩। একটি নীলাভ সবুজ শৈবালের প্রজাতির নাম লিখ।

উত্তর: Anabaena sp.

৪। ক্যালসিয়াম কার্বনেটযুক্ত একটি শৈবালের নাম লেখ।

উত্তর: Chara


আরো পড়ুন: 


রিলেটেট কিওয়ার্ড: শৈবাল এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব, শৈবাল কি?শৈবাল, শ্যাওলা অর্থ, শ্যাওলা প্রতিশব্দ, শৈবাল এর ছবি, সামুদ্রিক শৈবালের নাম, শৈবাল এর বৈশিষ্ট্য, শৈবালের উপকারিতা ও অপকারিতা, শৈবালের কোষ প্রাচীর কি দিয়ে গঠিত, শৈবালের নীর কোনটি, শৈবাল সাগর কোথায় অবস্থিত, শৈবাল সাগর কাকে বলে? কোন মহাসাগরে দেখা যায়, শৈবাল সাগর উৎপত্তি হয়েছে কেন, শৈবাল দীঘিরে বলে, শৈবাল অর্থ, ছত্রাক অর্থ, উপনিবেশ গঠনকারী শৈবালের নাম কি, বহুকোষী শৈবালের উদাহরণ, ফাইকোলজি কাকে বলে?

*

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post